বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট লিগাল ডাইজেস্ট

আপিল বিভাগের রায় বিশ্লেষণ ও সারসংক্ষেপ

Reference Digest

মামলার পরিচিতি (Case Citation & Info)

আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ

বেঞ্চ: বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম

মামলা নম্বর: Civil Petition for Leave to Appeal No. 494 and 495 of 2018

রায়ের তারিখ: ২৪ জুলাই, ২০২৪

পিটিশনার (বিবাদী): Engr. Md. Shaheedullah

রেসপনডেন্ট (বাদী): Mrs. Shahana Neyamat and others

মূল বিষয়বস্তু: Specific Performance of Contract (চুক্তি প্রবলের মোকদ্দমা)

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ (Brief Facts)

বাদী (রেসপনডেন্ট) দাবি করেন যে, বিবাদী (পিটিশনার) তার একটি ফ্ল্যাট ১৮,২০,০০০ টাকায় বিক্রয়ের জন্য ১৬.০৫.২০০২ তারিখে একটি মৌখিক চুক্তি করেন এবং অগ্রিম হিসেবে ১২,০০,০০০ টাকা গ্রহণ করে ফ্ল্যাটের দখল হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে বিবাদী ফ্ল্যাটটি রেজিস্ট্রি করে দিতে অস্বীকৃতি জানালে, বাদী সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন অনুযায়ী চুক্তি প্রবলের মামলা (Title Suit No. 11 of 2004) দায়ের করেন।

অপরদিকে, বিবাদী দাবি করেন যে তিনি উক্ত ফ্ল্যাটটি ইসলামী ব্যাংক-এ বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ করেছেন এবং ব্যাংক এর অনুমতি ব্যতীত তা বিক্রয়যোগ্য নয়। তিনি আরও দাবি করেন যে, বাদীর স্বামী একজন ভাড়াটিয়া ছিলেন এবং উক্ত ১২ লাখ টাকার লেনদেন মূলত একটি জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসার (Manpower export) উদ্দেশ্যে হয়েছিল, ফ্ল্যাট বিক্রয়ের জন্য নয়। বিচারিক আদালত বাদীর মামলা খারিজ করে দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগ আপিল মঞ্জুর করে ফ্ল্যাটের মূল্য ৩৬,০০,০০০ টাকা নির্ধারণ করে বাকি ২৪,০০,০০০ টাকা প্রদানের শর্তে ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির আদেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে বিবাদী আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করেন।

আপিল বিভাগের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ (Judicial Analysis)

১. মৌখিক চুক্তির আইনগত ভিত্তি ও প্রমাণ

আদালত Moslemuddin vs. Md. Jonab Ali (50 DLR AD 13) মামলার নজির উল্লেখ করে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, মৌখিক চুক্তি আইনের দৃষ্টিতে বারিত না হলেও তা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই (Closely scrutinized) করতে হবে। বাদীপক্ষে সাক্ষীরা চুক্তির শর্তসমূহ, যেমন- প্রতিদান (Consideration) এবং দলিল সম্পাদনের সময়কাল সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। Specific Relief Act, 1877; Sec 21(b) অনুযায়ী চুক্তির শর্তসমূহ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলে তা প্রবলযোগ্য নয়।

২. চুক্তিমূল্য নির্ধারণে আদালতের এখতিয়ার

আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ করেন যে, হাইকোর্ট বিভাগ স্বপ্রণোদিত হয়ে ফ্ল্যাটের মূল্য ১৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩৬ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করেছে। চুক্তি প্রবলের মোকদ্দমায় চুক্তির শর্তের বাইরে গিয়ে চুক্তিমূল্য (Consideration) পুনঃনির্ধারণ করার কোনো বিচারিক ক্ষমতা (Judicial power) ট্রায়াল কোর্ট বা আপিল আদালতের নেই। হাইকোর্ট বিভাগের এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ এখতিয়ার বহির্ভূত এবং আইনগত ভ্রান্তি (Error of law)।

৩. পক্ষভুক্তির ত্রুটি (Defect of Party)

বিবাদী তার লিখিত জবাবে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে ফ্ল্যাটটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ, উত্তরা শাখায় বন্ধক (Mortgage) রাখা আছে। Sooraya Rahman vs. Hajee Md. Elias (8 BLC AD 7) মামলার নজির অনুসরণ করে আপিল বিভাগ সাব্যস্ত করেন যে, বন্ধকী সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা ব্যাংক একটি প্রয়োজনীয় পক্ষ (Necessary party)। ব্যাংককে পক্ষভুক্ত না করায় মামলাটি গঠনগত দিক থেকে ত্রুটিপূর্ণ।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Final Order)

আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের প্রদত্ত রায় ও ডিক্রি বাতিল (Set aside) করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন।

তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আপিল বিভাগ বিবাদীকে নির্দেশ দেন রায়ের কপি প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে বাদীর প্রদানকৃত ১২ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। যেহেতু বাদী ২০০২ সাল থেকে বিনা ভাড়ায় ফ্ল্যাটটি ভোগদখল করছেন, তাই টাকার উপর কোনো ক্ষতিপূরণ বা সুদ (Solatium) প্রদান করা হয়নি।

আইনজীবীদের জন্য প্র্যাকটিস নোট

  • মৌখিক চুক্তির ক্ষেত্রে Section 53A of Transfer of Property Act প্রযোজ্য নয়, কারণ তা কেবল লিখিত চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
  • আদালতে চুক্তি প্রবলের মামলা দায়েরকালে বন্ধকী সম্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই পক্ষ (Defendant) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • নজির হিসেবে উপস্থাপন: কোনো আদালত যদি চুক্তির বাইরের শর্ত আরোপ করে বা মূল্য পুনঃনির্ধারণ করে, তবে এই রায়ের রেফারেন্স দিয়ে তা এখতিয়ার বহির্ভূত প্রমাণ করা যাবে।

সাধারণ নাগরিকদের জন্য আইনি সতর্কতা

  • জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে কখনোই মৌখিক চুক্তির উপর নির্ভর করবেন না। সর্বদা রেজিস্ট্রিকৃত বায়না দলিল বা লিখিত চুক্তি করুন।
  • সম্পত্তি কেনার আগে যাচাই করুন সম্পত্তিটি কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কাছে দায়বদ্ধ (Mortgaged) কি না।
  • নগদ অর্থে বড় অঙ্কের লেনদেন এড়িয়ে চলুন এবং প্রতিটি লেনদেনের সুস্পষ্ট রসিদ বা ব্যাংকিং প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।